Tanchangya

তঞ্চঙ্গ্যা পরিচিতিঃ তঞ্চঙ্গ্যারা মূলত মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত। নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তঞ্চঙ্গ্যারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূলত মঙ্গোলীয় নৃধারাভূক্ত জনগোষ্ঠী। এদের ভাষা ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীভূক্ত। তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষা ইন্দো-আর্য ভাষা থেকে থেকে আসা বাংলা আদি রূপের সমতুল্য। পালি, প্রাকৃত ও সংস্কৃত শব্দে এ ভাষা পরিপূর্ণ। চাকমা ভাষার সাথে উচ্চারণগত সামান্য পাথর্ক্য থাকলেও অনেকাংশ মিল রয়েছে। আবার তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষা চাকমাদের মত পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক ভাষা কিছুটা মিশ্রিত রয়েছে। ভাষা ও সংস্কৃতিগত সামঞ্জস্যের কারণে তঞ্চঙ্গ্যাদের চাকমাদের একটি শাখা বলে মানে হলেও কিছু স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের জন্য তাদের পৃথক জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহিৃত করা হয়েছে। আবাসগৃহের ধরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, আলাদা অলংকারের কারণে চাকমাদের থেকে তঞ্চঙ্গ্যাদের পৃথক করা যায়। এরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। অনুসন্ধ্যানে জানা গেছে, যিনি জন্মগতভাবে তঞ্চঙ্গ্যা তথা তঞ্চঙ্গ্যা পরিবারে জন্মগ্রহণকারী, পিতা তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর সদস্য, একজন তঞ্চঙ্গ্যা পুরুষের ঔরসজাত ও একজন তঞ্চঙ্গ্যা মহিলা গর্ভজাত ভূমিষ্ট অবৈধ সন্তানও তঞ্চঙ্গ্যা বলে সামাজে গণ্য হবে। মূলতঃ তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীরভূক্ত একজন পুরুষের ঔরসে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিই তঞ্চঙ্গ্যা পরিচয়ের অধিকারী। তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্বার অন্তর্ভূক্ত কোন পরিবারে জন্মগ্রহণকারী শিশুর সামাজিক পরিচিতি তঞ্চঙ্গ্যা বলেই স্বীকৃত হবে। তবে মাতাকে তঞ্চঙ্গ্যা নারী হতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এছাড়া ও দত্তক সূত্রে তঞ্চঙ্গ্যা পরিবারে লালিত সন্তানও তঞ্চঙ্গ্যা পরিচয়ে পরিচিতি লাভ করবে। তঞ্চঙ্গ্যারা সাধারণত উঁচু মাচাং ঘরে বসবাস করে। এক সময় আরাকানে দৈংনাক নামে তঞ্চঙ্গ্যারা পরিচিত ছিল। তঞ্চঙ্গ্যারা উক্তর-পশ্চিম দিকে সরে এসে বান্দরবানের মাতামূহুরীর উপনদী তৈনছড়িতে বসবাস শুরু করে। তৈন টংগ্যা এবং তঞ্চঙ্গ্যা একই জনগোষ্ঠীর নির্দেশক। পরবর্তীতে তঞ্চঙ্গ্যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করতে শুরু করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে তঞ্চঙ্গ্যারা রাঙ্গামাটি জেলার চাকমা সার্কেল ও বান্দরবান জেলার বোমাং সার্কেল ও কক্সবারের অধীনে তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বসবাসকারী তঞ্চঙ্গ্যাদের ৭টি গছা (গোত্র) গুই্‌ত্তির (গোষ্ঠী) নাম পাওয়া যায়। গছা (গোত্র) গুলো হলো-দৈন্যা গছা, মো গছা, কার্‌বয়া গছা, মংলা গছা, স্মেলং গছা, ল্লাং গছা, অঙ্য গছা‘ গুই্‌ত্তি (গোষ্ঠী) গুলো হলো-পাশোই, পল্ডিত, তাঞ্জব, ব্যাব, পিশো, রাঙেয়া, বলা, বাঙাল্যা, দান্নোয়া, খাওল, তাশি, কবাল্যা, গুণ্য, কুরুগ, হ্‌আগারা, খুস্যোয়া, গচাল্যা, কারাংশা, ল্লাপোস্যা, আর্‌বয়া, বক্‌চারা, বুঙ, বলা, পালংশা, দাবন্যা, নাবানা, বেদা, কালেয়া, আমেলা, আলু, তেমেলে, পক্‌ত, বেদব, শক্কা, লাম্বায়া। অনুস্যানে জানা যায়, এদের গছা/গুই্‌ত্তির লোক আরাকানসহ মায়ানমারে রয়েছে। অনেক পরিবার মায়ানমার জাতিতে মিশেও গেছে। বাংলাদেশে পার্বত্য জেলা গুলোতে এককালে অঙ্য গছা ছিল তারা আস্তে আস্তে সবাই মো গছা ও ধৈন্যা গছার সাথে অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। কক্সবাজারে রামু, উখিয়া ও টেকনাফের তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর লোকজন এখনো চাংমা লিখে থাকে।


জীবন জীবিকাঃ- তঞ্চঙ্গ্যা নৃ-গোষ্ঠীর প্রধান পেশা কি তা সঠিক ভাবে জানা না গেলেও পার্বত্য জেলা গুলোতে বসবাসরত তঞ্চঙ্গ্যারা জুম চাষাবাদের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। তঞ্চঙ্গ্যা নারী-পুরুষ উভয় পরিশ্রমী।

তঞ্চঙ্গ্যা জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহে সামাজিক বাধ্য বাধকতা ও রীতিনীতি আচার-অনুষ্ঠানঃ- তঞ্চঙ্গ্যা জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহে অধ্যায়কে তঞ্চঙ্গ্যা সামাজিক বাধ্যবাধকতা ও রীতিনীতি আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজসিদ্ধ করেছে। এসব রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠানকে তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে অলঙ্ঘনীয় করা হয়েছে।

শিশু জন্মশুদ্ধি ও সামাজিক আচারঃ- তঞ্চঙ্গ্যা পরিবারে শিশু জন্মের সময় প্রসূতিকে সাহায্য করার বাঁশের ফালি থেকে নেয়া ‘দুলুক্‌’ তীক্ষ্ণ ধারালো দিয়ে কাটা হয়। নবজাত শিশুকে সহনীয় গরম জলে স্নান করিয়ে মায়ের পাশে শুকনা কাপড় জড়িয়ে রাখা হয়। অশুচি সময় পর্যন্ত প্রসুতিকে আতুঁর ঘরে সন্তানসহ রাখা হয়। এসময় তার ব্যবহার্য জিনিস ছাড়া সংসারের অন্যান্য জিনিসপত্র ষ্পর্শ করা নিষিদ্ধ রয়েছে। অশুচিকাল শেষ হলে এক পাত্র পানির মধ্যে ‘ঘিলা’ নামক বিচির শাঁস ও ‘কশৈই’ পানি বা পবিত্র পানি ঔষধি, হলুদের টুকরাসহ সোনা ও রূপা রেখে প্রসূতি ও নবজাতকের উপর ও আতুঁর ঘরের চারিদিকে ছিটিয়ে শুচিশুদ্ধ করা হয়। অনুষ্ঠানকে কশৈই-পানি বলে। অনুষ্ঠানের দিনে ধাত্রী বা অসা মেলাকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো হয় ও তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক পরিশোধ করা হয়। এর পর প্রসূতি সংসারের স্বাভাবিক কাজকর্মে অংশ নেয়।

সৎকার রীতিঃ- তঞ্চঙ্গ্যাদের সমাজে কারো মৃত্যু হলে মৃত ব্যক্তির মূখের ভেতর ১টি ধাতব (টাকা) মুদ্রা দেয়া হয়। টাকা দেয়ার উদ্দেশ্যে হলো মৃত ব্যক্তির আত্মাকে পরলোকে পাড়ি দেওয়ার খরচ দেয়া। এরপর মৃত ব্যক্তিকে স্নান করিয়ে নতুন সাদা কাপড় পড়িয়ে বাঁশের তৈরী শবাধার (সামাইন ঘর) এর উপর ইচ্ছানুসারে টাকা-পয়সা রেখে যায়। মৃতের ঘরে দরজায় ১টি মাটির পাতের তুষের আগুন জ্বালিয়ে (আইল্যা বেলা) রাখা হয়। শবদাহ করার পরের দিন মৃত ব্যক্তির সন্তানেরা মাথা মুড়িয়ে ফেলে। শ্মশানে কাঠ দিয়ে চিতা তৈরি করে রাখা হয়। পুরুষ হলে ৫ স্তর চিতা মহিলা হলে ৭ স্তর চিতা করা হয়। ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান শেষ করে প্রথমে জ্যেষ্ঠ পুত্র ৭ বার চিতা প্রদক্ষীণ করে শবদেহের মুখে এবং চিতায় আগুন দেয়া হয়। শবদাহ শেষে শ্মশান থেকে ফেলে আসা পর ঘরের দরজায় রাখা চন্দন মিশ্রিত পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে শ্মশান যাত্রীরা কিছু পানি মাথায় ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তিতা পানি মুখে দিয়ে শুদ্ধ হয়ে নিজ নিজ ঘরে প্রবেশ করে থাকে। শবদাহের পরে দিন সকালে শ্মশানে গিয়ে সন্তান অথবা স্বগোত্রীয় কেউ শবদেহের ছাইভষ্ম থেকে বিভিন্ন অস্থির সামান্য অংশ সংগ্রহ করে মাটির একটি নতুন হাঁড়িতে রেখে  নতুন সাদা কাপড় দিয়ে মুখ বেঁধে পানিতে ডুব দিয়ে মাটির হাঁড়িটি মাথার উপর থেকে পেছনের দিকে ফেলে দেয়। ঐ ডুবে থাকা ব্যক্তি তার ডান হাত পানির উপরে তোলার পর পর অপর একজন তার কনিষ্ঠ আঙ্গুরে সুতা বেঁধে টেনে তুলে নেয়। শবদাহের ৬ দিন পরক্রিয়া অনুষ্ঠানে (সাতদিন্যা) অনুষ্ঠানে মৃতের আত্মার শান্তি কামনায় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আমন্ত্রণ করে মঙ্গলসূত্র শ্রবণ ও সামাজের লোকজন ও আত্মীয়স্বজনদের নিমন্ত্রণ খাওয়ানো হয়। অনুষ্ঠানে মৃতের আত্মার শান্তি কামনায় বৌদ্ধভিক্ষুদের টাকা-পয়সা ও নানা বিবিধ দানীয় সামগ্রী উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়।

বিবাহ রীতিঃ- বিবাহযোগ্য পাত্রের পিতা-মাতা, অভিভাবক বা আত্মীয়স্বজন তাদের পছন্দনীয় পাত্রীর সন্ধান পেলে অথবা পুত্রের মনোনীত বা পছন্দের পাত্রীর খোঁজ পেলে ঘরোয়া বৈঠকে শলাপরামর্শ করে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরপর পাত্রীর বাড়িতে গিয়ে মা-বাবার কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়। মা-বাবা ও পাত্রীর সম্মতি পাওয়া গেলে শুভদিন নির্ধারণ করে পাত্রপক্ষকে পাত্রীর বাড়িতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যেতে হয়। এসময় একজোড়া নারিকেল, পান-সুপারী, পিঠাসহ নানা উপকরণ ‘বউ পুছা পরানা’ যেতে হয়। এভাবে তিনবার পাত্রীর বাড়ি যেতে হয়। তৃতীয়বারে বিয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়। প্রথমবারে বিয়ের প্রস্তাবে পাত্রীপক্ষ রাজী হয় না। বিয়েতে পাত্রীপক্ষ সমমত হলেই পাত্রপক্ষের উপকরণ সামগ্রী গ্রহণ করে ও পাত্রপক্ষকে আপ্যায়নের মাধ্যমে বিয়ের শুভদিন ও দাবী দাভাসহ বোয়ালী/সাজনী সামগ্রীর পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।

দাভা প্রথাঃ- তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে কনেপণ (দাভা) প্রথা প্রচলিত আছে। পাত্র বা তার পিতাকে পাত্রীর পিতার নিকট নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ পণ দিতে হয়। দাভা দেয়া সামাজিক নিয়মে বাধ্যতামূলক। কন্যা পালিয়ে বিয়ে করলে পিতার পাত্রপক্ষের কাছে দাভা বেশী দাবী করতে পারে।

সাজনী প্রথাঃ- তঞ্চঙ্গ্যা সমাজের সামাজিক/নিয়মিত বিয়েতে কনে সাজানোর পোশাক, অলংকার ও প্রসাধনী সামগ্রী পাত্রপক্ষের কাছে দাবী করা হয়। এসব সামগ্রীকে সাজনী বলা হয়। সামাজিক রীতি অনুসারের কনেপক্ষের দাবী করা সাজানী বরপক্ষ দিতে বাধ্য থাকে। এসব কনের সম্পত্তি বা স্ত্রী ধন হিসেব গণ্য হয়। বউ পুছা গরানার এ সকল আনুষ্ঠানিকতার পর কোন কারণে যদি কনেপক্ষ বিয়েতে অসম্মতি জানায় তাহলে তঞ্চঙ্গ্যা সমাজের কাছে সেটা বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় এবং পাত্রের বাবা ও অভিভাবকের নিকট পাত্রীর বাবাকে সামাজিক দন্ড হিসেবে ক্ষমা প্রার্থনা করে ‘লাজভার’ (জরিমানা) দিতে হয়। পাত্রপক্ষে বেলায় একই নিয়ম রয়েছে। যে পাত্রীর বউ পুছা গরানা হয় সেই বিয়ের প্রস্তাব ভেঙ্গে না গেলে অন্য কোন পাত্রের পক্ষ থেকে সেই পাত্রীর জন্য বিয়ের প্রস্তাব দেয়া সামাজিক রীতি বিরুদ্ধ।

বউ খজা যানা (বরযাত্রী যাওয়া):- বিয়ের (সাঙা) দিন বরকে সাজিয়ে নিয়ে বয়স্ক একজন পুরুষ ও একজন মহিলা বর এর মা ও বাবা ভূমিকা পালন করে থাকেন। কনের সাজনী সামগ্রীসহ বরযাত্রীর সাথে নেয়া হয়। সাজনী সামগ্রী ভর্তি ‘ফো-কাল্লং’ নেবার জন্য পাত্রের চেয়ে ছোট বয়সের একজন যুবতীকে দায়িত্ব দেয়া হয়। বরের বন্ধু বা দুলাভাই যে কোন একজনকে অবশ্যই সাথে থাকতে হবে। তিনি সর্বদা বরের পাশে থেকে বিয়ের অনুষ্ঠানে সহায়তা করেন এবং তার পক্ষ হয়ে কথা বলেন। এটিকে তঞ্চঙ্গ্যারা ‘সাবালা’ বলে। বরের পেছনে ‘ফো-কাল্লং’ বহনকারী সারিবদ্ধ হয়ে পুরুষ ও মহিলা মিলে বেজোড় সংখ্যক বরযাত্রী দল রওয়ানা হবার রীতি আছে। আবার নতুন বউ নিয়ে জোড় সংখ্যা মিলিয়ে বরযাত্রীদের ফিরে আসার নিয়ম রয়েছে।

বর বরণ প্রথাঃ- কনের বাড়িতে যখন বরযাত্রীরা পোঁছানো সাথে সাথে বিয়ের আসরে কনেকে লুকিয়ে রাখা হয়। এরপর বাড়ির দরজায় বরের মা-বাবা ও বরকে কনের চেয়ে ছোট বয়সের এক যুবতী পা ধুয়ে দিয়ে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়। কনের ভাবী সর্ম্পকের একজন মহিলা (এই মহিলাটি এমন হতে হবে যার কোন সন্তান মারা যায়নি) অথবা ভগ্নিপতি সর্ম্পকের একজন পুরুষ এসে ১টি ডিম হাতে নিয়ে বরের মাথায় চার পাশে ঘুরিয়ে পেছন দিকে ছুড়ে ফেলে দেন। এরপর তিনি নিজের ডানহাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুল দিয়ে বরের বামহাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুল ধরে বরকে ঘরে তুলে কনের পাশে বসিয়ে দেন। এসময় বর কনের মাঝখানে পর্দার আড়াল রাখা হয়। কনের পক্ষের একজন ‘সারালা’ বিয়ের অনুষ্ঠানে বর ও কনকে ঘনিষ্টভাবে পাশাপাশি বসিয়ে দিয়ে ১টি সাদা কাপড় দিয়ে উভয়ের কোমড় বেঁধে দেয়। এসময় কনের ডানহাত উপর বরের ডানহাত তালু উপর রেখে সাবালাকে মঙ্গল ঘট হাতে নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলকে তিনবার বিয়ে সম্পন্ন করার অনুমতি চাওয়া হয়। সকলে সমবেত কন্ঠে সমমতি জ্ঞাপনের পর সাবালা মঙ্গল ঘটের পানির বর-কনের হাতের উপর ঢেলে দিয়ে ল্লাত্তংবানা/ফং গরানা সম্পন্ন করে বিবাহ কর্ম সমাজসিদ্ধ করেন। এসময় উপস্থিত সকলেই সমবেত কন্ঠে ‘পাত-তুরুতুরু’ শব্দে বিয়ের শুভ সূচনা করেন। এরপর বর-কনকে সাবালা ৭ বার উঠা-বসা করানো হয়। বিয়ের দিন ‘চুমুলাঙ’ পুজা করা হয়। ‘চুমুলাঙ’ পুজা একটি তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠান ছাড়া বিয়ে সমাজসিদ্ধ হয় না এবং স্বামী-স্ত্রী রূপে একে অপরে উপর সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করার সময় ডিম, মুরগী ও পুরুষ শুকর বলি দিতে হয় এবং অনুষ্ঠান চলাকালে উপস্থিত সকলকে মদ পরিবেশন করা হয়। দেবতার উদ্দেশ্যে ওসা (ওঝা) দিয়ে ‘চুমুলাঙ’ পুজা করা হয়। ‘চুমুলাঙ’ পুজা শেষে সামাজিক নানা অনুষ্ঠান শেষ করে বিয়ে সম্পন্ন করা হয়।

গাবুজ্যা দেবানঃ- তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে দেবান বা গাবুজ্যা দেবান নামে মৌখিক পদবীধারী যুবক সর্দার ছিল এবং গ্রামাঞ্চলে এখনো রয়েছে। এই দেবান বা গাবুজ্যা দায়িত্ব এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ অবিবাহিত যুবকই এ পদে অধিষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে বিয়ের পর এ পদাধিকার আর থাকে না। তখন অন্য একজনের হাতে দায়িত্ব অর্পিত করা হয়। দেবান বা গাবুজ্যা দায়িত্ব হচ্ছে তার এলাকাধীন সকল যুবক-যুবতীর উপর নজরদারী করা প্রধান দায়িত্ব। তার এলাকায় তার অনুমতি ছাড়া যুবতীর বাড়িতে কোন যুবক রাত্রিযাপন করে এবং যুবতীর সাথে অবাধে মেলা মেশা করে তাহলে সে যুবককে জবাবদিহি করতে হবে। দেবান অনুমতি ছাড়া কোন যুবতী যদি অন্য এলাকার গমন, রাত্রি যাপন, এমনকি মেলা বা বিয়ের নিমন্ত্রণে গেলে নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে সে যুবতীকে দেবান সর্তক করতে পারবে। যদি যুবক-যুবতীর গোপন প্রণয়, অবৈধ মেলামেশা ধরা পড়া, বিয়ের প্রস্তাব, মা-বাবার অজ্ঞাতে অন্য কোন পুরুষের সাথে পলায়ন অথবা নিষিদ্ধ সম্পর্কীয় আত্মীয় সাথে যৌন সর্ম্পক বিষয়ে কোনরূপ সন্দেহ বা ঘটনা প্রমাণিত হয় তাহলে গ্রামে সালিশ/বিচাবে দেবানকে ও অভিযুক্ত করা হয়। কেননা যুবতীদের দেখা শুনার দায়িত্ব দেবানের উপর থাকে। তঞ্চঙ্গ্যা যুবক-যুবতীদের সামাজিক নিয়মকানুন মেনে চলা এবং শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে দেবানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তঞ্চঙ্গ্যা নৃ-জনগোষ্ঠির আদি সংস্কৃতিঃ- তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের এদের উৎসব গুলো চাকমা সম্প্রদায়ের সাথে কিছুটা মিল রয়েছে। তঞ্চঙ্গ্যা আদিবাসীর প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান গুলো হচ্ছে-বুদ্ধ পূজা, সংঘদান, প্রবারণা, কঠিন চীবর দান, মাঘী পূর্ণিমায় বুহ্যচক্র মেলা, বিষু, গর্যাপর্যা, ফুলবিষু, মূলবিষু। আর এদের উৎসব ও আদি সংস্কৃতি মধ্যে রয়েছে, গিঙ্গুলী গীত (লোকজ সংগীত), পিঠা উৎসব, ঘিলা খেলা, জুম নৃত্য।

গর্যাপর্যা, ফুলবিষু, মূলবিষু উৎসবঃ- তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের গর্যাপর্যা, ফুলবিষু, মূলবিষু উৎসব চাকমাদের মতো। প্রধান সামাজিক উৎসব বিষু বা বিঝু উদ্‌যাপনের চাকমাদের সঙ্গে খুব একটা পার্থক্য নেই বলে চলে। নতুন বছরের প্রথম দিন ও বিদায়ী বছরের শেষ দুইদিন গর্যাপর্যা দিন বলা হয়।

© ২০১৫ বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ (বিএইচডিসি)