Pankhowa

পাংখোয়া পরিচিতিঃ- পাংখোয়া আদিবাসীর পূর্ব পুরুষেরা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথমে কোথায় থেকে এসেছে এর কোন সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও তবে ধারণা করা হয় এরা ভারতের মিজোরাম ও আরাকান থেকে এদেশে এসেছে। এরা রাঙ্গামাটির বিভিন্ন উপজেলার এবং বান্দরবানের রুমা, থানছি ও সদর উপজেলায় বিভিন্ন পাহাড়ী এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছে। পাংখোয়া নৃ-জনগোষ্ঠী মূলত মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠী অন্তর্ভূক্ত এবং টিবেটো-বার্মেন শাখার অন্তর্গত ভাষাভাষি সম্প্রদায়। পাংখোয়াদের শিমুল গাছের বন আছে এবং শিমুল ফুল ফুটেছে এ ধরণের পাহাড়ে বসবাস করতো। তাই তারা নিজেদেরকে শিমুল গাছের বনযুক্ত পাহাড়ের লোক নামে পরিচয় দিয়ে থাকে।  শিমুল গাছের বনযুক্ত পাহাড়ের লোক এর অর্থ (পাংখোয়া)। আবার কোন কোন সময় তারা নিজেদের লুসাই বলে পরিচয় দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। লুসাই ভাষার সাথে পাংখোয়া ভাষার মিল পাওয়া যায়। তাদের অধিকাংশই এখন খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। পাংখোয়া মেয়েরা পিতলের তৈরি বিভিন্ন ধরনের কটিবন্ধ ব্যবহার করে থাকে। পাংখোয়া সমাজ ১৭টি গোত্রে বিভক্ত রয়েছে। গোত্র গুলো হচ্ছে- চাংনাম, লাইত্‌লায়াং, সেইজাং, সেভাল, সিমলা, লাইবোর, লেইসাতে, রামা, দন, দানজাং, খোয়ালরিং, রিপাচেই, পালৌ, লাইসোয়া, বং খোয়াই, লেই হাং ও সাথং। পাংখোয়া জনগোষ্ঠীভূক্ত একজন পুরুষের ঔরসে তাকে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিই পাংখোয়া পরিচয়ের অধিকারী। পাংখোয়া জাতিসত্বার অন্তর্ভূক্ত কোন পরিবারে জন্মগ্রহণকারী শিশুর সামাজিক পরিচিতি পাংখোয়া বলেই স্বীকৃত হবে। তবে মাতাকে পাংখোয়া নারী হতে হবে এমন কোন সামাজিক বাধ্যবাধকতা নেই।

জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহে সামাজিক বাধ্যবাধকতাঃ- পাংখোয়া জনগোষ্ঠী জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহে এই তিনটি বিষয়কে সামাজিক ও রীতিনীতি আচার-অনুষ্ঠানের দ্বারায় সমাজসিদ্ধ করেছে। এসব রীতিনীতি আচার-অনুষ্ঠান পাংখোয়া সমাজে মেনে চলা হয়।

শিশু জন্মশুদ্ধিঃ- পাংখোয়া সমাজভূক্ত কোন পরিবারে শিশু জন্মের সময় উপস্থিত ধাত্রী ও সাহায্যকারীদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানোর রীতি রয়েছে। সমাজের প্রাচীন রীতি অনুসারে শিশু জন্মের পর বাড়ির শিড়ির গোড়ায় ১টি শুকর ছানা এবং নদীতে মুরগী অবশ্যই বলি দিতে হবে। সন্তান জন্মের পর নবম দিনে কিংবা একমাস পর পারিবারিকভাবে নামকরণ অনুষ্ঠান করা হয়। পুত্র সন্তান হলে ১টি লাল মুরগী বধ করা হয় এবং ৫ পাত্র মদসহ পাড়ার সকলকে আপ্যায়নের আয়োজন করা হয়। আর কন্যা সন্তান হলে ২টি মুরগী ও তিন পাত্র মদের পাড়ার লোকজনকে আপ্যায়নের করা হয়ে থাকে। এই অনুষ্ঠানে যিনি ওঝা তিনি সবার আগে আহার গ্রহণ করবেন।

বিয়ের রীতিঃ- পাংখোয়া সমাজে পাত্র ও পাত্রী পক্ষের মধ্যে বিয়ের প্রস্তাব আদান-প্রদান এবং কনের পণ নির্ধারণের জন্য উভয়পক্ষের মতামত নিতে ঘটক নিয়োগ করা হয়ে থাকে । পাত্রপক্ষের ঘটককে ‘নিপারেল’ আর পাত্রীপক্ষের ঘটককে ‘নুনাবেল’ বলা হয়। বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার পর কনেপক্ষ রাজী হলে দ্বিতীয় দফায় পাত্রপক্ষ ঘটকের কথাবার্তার মাধ্যমে কনের পিতাকে বায়না হিসেবে কিছু টাকা (পূর্ব ২টি রৌপ্য মুদ্রা) প্রদান করেন। ‘ইনকাই’ গ্রহণের পর আর কোন পাত্র সেই পাত্রীর জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারে না। আর বিয়ের চলাকালীন পাত্রপক্ষ মত পরির্বণ করলে সমাজে জরিমানা হিসেবে মাদী গয়লা দিতে হয়। পাত্রপক্ষের ঘটক তৃতীয় বারে কনের বাড়িতে গিয়ে পাত্রীর পণ হিসেবে টাকা ও বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করে। কনের পণ হিসেবে প্রাচীন সমাজের রীতি অনুসারে ৩০ টাকা হতে ১৫০ টাকা দিতে হয়। এরপর কনের মুখ দেখার জন্য ৩০ টাকা দিতে হয়। বর তার শ্বশুরের কাছে কায়িক শ্রমের বিনিময় ‘মান’ শোধ করতে হয়। এ মানের টাকা থেকে ১০% কনের মামাকে দিতে হয়। অন্যথায় মামা আপত্তি জানিয়ে বিয়ে স্থগিত করতে পারে। বিবাহের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান প্রথমে পাত্রীর বাড়িতে হয়। আবার মান করা টাকা থেকে কনের আত্মীয়স্বজনকে ‘সুইরাং’ (বখশিস) দিতে হয়। ‘সুইরাং’ গ্রহণকারী আত্মীয়স্বজনকে কনের শ্বশুর বাড়ি যাত্রার সময় সহযোগি হতে হয়। কনে শ্বশুরবাড়ি যাবার সময় বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া ১টি মুরগীকে পরদিন ভোর বেলায় ‘লুকার্থা’ অনুষ্ঠানে মরিচ ছাড়া রান্না করে কনেপক্ষের ‘নুনারেল’ ও বরপক্ষের ‘নিপারেল’ এবং বর কনেসহ উভয়ের ২ জন বন্ধু মোট ৬ জন মিলে আহার করে থাকে। ‘লুকার্থা’ অনুষ্ঠানের দিনে সুর্য উঠার আগে স্বামী-স্ত্রী ও তাদের ২ বন্ধুসহ চারজন মিলে পাহাড়ী ছড়া বা নদী থেকে পানি তুলে আনে। বর বধূর তুলে আনা এই পানিকে পবিত্র পানি মনে করা হয়।

সৎকার রীতিঃ- পাংখোয়া পরিবারে কারো মৃত্যু হলে গ্রামবাসী সকলে মৃতের বাড়িতে সমবেত হয়ে শোক প্রকাশ করার নিয়ম সমাজে রয়েছে। সৎকারে উদ্দেশ্যে শবদেহ কফিনে রেখে দূরবর্তী জঙ্গলে নিয়ে শুন্যে ঝুলিয়ে রাখার হয়। কফিনের নীচে পরিবারের আত্মীয়স্বজনকে প্রতিদিন ধোঁয়া দিতে হতো। এক বছর পর্যন্ত এই নিয়মে রাখার পর কফিন হতে শবদেহের প্রতিটি হাড় ধুয়ে পরিস্কার করে নিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন কাপড়ে বেধে কবর দেয়া হয়। পাংখোয়াদের প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাসমতে দেবতা খোজিং তাদের বংশের দেবতা। খোজিং হচ্ছে পোষা কুকুর বা বাঘ। তাই প্রভূর সন্তান পাংখোয়াদের কোন ক্ষতি বাঘ বা কুকুর করে না। দেবতার খোজিং এর উদ্দেশ্যে তারা পূজা ও বলি উৎসর্গ করে। বলি দেয়া পশুর নাড়িভুড়ি দিয়ে ‘খোবাং’ শুভাশুভ বিচার করা হয়। পাংখোয়ারা ঘরের মধ্যে বলি দেয়। তবে অতীতে তাদের নরবালির প্রথাও ছিল। পাংখোয়া জনগোষ্ঠীর প্রাচীন বিশ্বাসমতে মানুষ যেখান এসেছে মৃত্যুর পর সেখানের একটি বড় পাহাড়ে চলে যায়। পাংখোয়াদের মতে সেটা মৃতদের দেশ। সেখান থেকে ফিরে আসার জন্য সকলে কান্নাকাটি করে। কিন্তু জীবিত অবস্থায় যে মানুষ সৎর্কম না করে এসে পৃথিবীতে ফিরে আসে না। পাংখোয়া সমাজে কোন কঠিন শপথ নিতে হলে নদীতে গিয়ে নিতে হয়। এ সময় তারা দা, বল্লম, বন্দুক এবং রক্ত ষ্পর্শ করে শপথ নিয়ে থাকে। শপথকে তারা অত্যন্ত পবিত্র মনে করে। তাদের বিশ্বাস যে শপথ ভঙ্গকারী সে নিজে ও তার পরিবার ভয়ংকর পরিণতির শিকার হবে এবং মৃত্যুবরণ করবে। সাধারনত গোত্রের সর্দার বা দলনেতার বল্লম ষ্পর্শ করে তারা শপথ নেয়। পাংখোয়ারা এককালে জড়ো উপাসক ছিল। ধর্মীয় প্রাচীন বিশ্বাসমতে তাদের প্রধান দেবতার নাম ‘পাথিয়েন’। তিনি পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা এবং পশ্চিমে থাকেন ও রাত্রিকালে সূর্যের দায়িত্ব নেন। আর অপর দেবতার নাম খোজিং।

© ২০১৫ বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ (বিএইচডিসি)