Mro

ম্রো পরিচিতি: বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্রোদের বসবাস সকল নৃ-গোষ্ঠি গুলোর আগে থেকে রয়েছে। তবে ম্রো পার্বত্য চট্টগ্রামে কখন বা কত সাল থেকে বসবাস করছে এর সঠিক ও সুনিষ্টি কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ম্রো প্রথম মিয়ানমান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম এসেছেন বলে জানা গেছে। ম্রোরা আরাকান (মিয়ারমান) ও বান্দরবানে প্রাগৈতিহাসিককাল ধরে বসবাস করছে। তাদের বৃহৎ অংশ এখনো আরাকানে বসবাস করছে। মিয়ারমারে ম্রোদের মায়ু বলা হয়। এদের রয়েছে অন্য আদিবাসীদের মত আলাদা ঐহিত্যময় ভাষা-সংস্কৃতি। দূর্গম ও সবচেয়ে বেশি উঁচু পাহাড়ে ম্রোদের বসবাস লক্ষ করা যায়। তারা দূর্গম ওউঁচু পাহাড়াতে বসবাস করতে বেশি প্রচন্দ করে। ২০১১ সালে সরকারী আদম শুমারী অনুযায়ী বান্দরবানে ম্রোদের সংখ্যা ৩৯,৫৬৫ জন। বর্তমানে বান্দরবান সদর উপজেলা, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানছি, লামা, আলীকদমের দূর্গম উঁচু পাহাড় গুলোতে ম্রোদের বসবাস রয়েছে।

জীবন জীবিকাঃ- ম্রোরা জুম চাষাবাদের মাধ্যমে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। তবে বর্তমানে অনেকেই মিশ্র ফলদ বাগানের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। তারা লবন ও তেল ছাড়া সব কিছুই নিজেরা উৎপাদন করে থাকে। জুম চাষ ও বিভিন্ন কাজে ম্রো সমাজে পুরুষ-মহিলা উভয় উভয়ই পরিশ্রম করে থাকে। এরা কখনোই অলস জীবনযাপন করে না। অবসর সময়ে বাড়িতে বসে হস্তশিল্পের কাজ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ম্রোদের হস্তশিল্প গুলোর সবচেয়ে আকর্ষনীয়। একমাত্র ম্রোরাই হস্তশিল্পের সব ধরনের কাজ জানে। তাদের সংসার ও পরিবারে পোষাক থেকে শুরু করে যাবতীয় সকল জিনিষপত্র নিজ হাতে তৈরি করে থাকে। পোশাক-পরিচ্ছদ এবং আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ম্রোরা এখনো সর্ম্পূণ নিজস্ব সাংস্কৃতির আবহ ধরে রেখেছে। এ কারণে ম্রোরা পার্বত্য চট্টগ্রাম আত্ম নির্ভরশীল জাতি হিসেবে পরিচিত।

জুম চাষ ও পূজার প্রচলনঃ- ম্রো সমাজে জুম চাষের পূর্বে মাছ, মাংস, মশল্লা ইত্যাদি আমিষ জাতীয় খাদ্য খাওয়া সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রয়েছে। এ রীতি ম্রো সমাজে এখানো প্রচলিত আছে। এরপর জুম থেকে উৎপাদিত ফসল ঘরে তোলার পর দেবতার সন্তুষ্টির জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ১ বোতল মদ, ১টি মুরগী যে কোন ছড়া বা খালে বলি দিয়ে পুজা দিতে হয়। তাদের ধারণা দেবতাকে সন্তুষ্ট করা না হলে পরবর্তী বছর জুমের ফসল ভাল হবে না।

ম্রো আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি, জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহঃ- জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহ এ তিনটি অধ্যায়কে ম্রো জনগোষ্ঠি তাদের সামাজিক রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের দ্বারা সমাজসিদ্ধ করেছে‘ এসব রীতি ও আচার-অনুষ্ঠানকে ম্রো সমাজে অলঙ্ঘনীয় করা হয়েছে।

শিশুর জন্মশুদ্ধি ও সামাজিক আচারঃ- ম্রো সমাজভূক্ত পরিবারে শিশু ভূমিষ্ট হবার পর বিশেষ কোন আচার-অনুষ্ঠান করা হয় না। গ্রামের ধাত্রী এসে প্রসূতীকে সন্তান প্রসবের সময় সাহায্য করে। সেন্তান প্রসবের পর মা ও শিশুকে নয়দিন পর্যন্ত ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হয় না। প্রসূতীকে শুধুমাত্র লবণ দিয়ে ভাত খেতে দেওয়া হয়। ৯দিন পর প্রসতীকে পাহাড়ি ছড়া, ঝর্ণা ও নদীতে নিয়ে স্নান করতে দেয়া হয়। এর পর প্রসূতী পরিবার ও সাংসারিক কাজ-কর্মে অংশ নিতে পারে।

ম্রো বিবাহ রীতিঃ- ম্রো জনগোষ্ঠির সমাজের ‘নিমাং‘ বিবাহ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। নিমাং এর অর্থ হচ্ছে দিনের বেলায় বউ ঘরে তোলা। ম্রো ছেলে মেয়েরা যখন বিয়ে উপযুক্ত হয়ে উঠে তখন তাদের কানে উপর সবসময় ফুল রাখে চলাফেরা করে থাকে। এতে সামাজের মানুষরা বুঝতে পারে সে বিয়ে উপযুক্ত এবং বিয়ে করতে চায়। বিবাহের ক্ষেত্রে বরপক্ষের পাড়া প্রতিবেশীসহ কনে বাড়িতে গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। এতে কনে পক্ষ রাজি হলে বরপক্ষের পাড়া প্রতিবেশীদের অনেকে বউ আনতে কনের বাড়িতে যায় এবং কনেপক্ষের লোকজন বরের বাড়ীতে আসে। বিবাহের অনুষ্ঠানে বরপক্ষের লোকজন কনের বাড়ীতে যাবার সময় মোরগ-মুরগী উপঢৌকন নিয়ে যেতে হয় এবং কনেপক্ষের লোকজনকেও বরের বাড়িতে মর্দা (পুরুষ) শুকর উপঢৌকন হিসেবে আনতে হয়। সমাজের রীতি অনুসারে কনে বিবাহের পণ বাবদ ১০০ টি রৌপ্য মুদ্রা অথবা রৌপ্য মূদ্রার পরির্বতে বর্তমানে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পণ দিতে হয়। এর মধ্যে ১০টি রৌপ্য বা ২৫০০ টাকা কনে মায়ের দুধের জন্য এবং ৫টি রৌপ্য বা ১২৫০ টাকা কনের মামার আশীর্বাদ লাভের জন্য বরপক্ষেকে কনেপক্ষেকে দিতে হয়। এছাড়াও ৩০টি বল্লম, ১টি তীর, ১টি দা ও ১টি তলোয়ার ও উপঢৌকন হিসেবে কনের বাবাকে দেয়া হয়। এরপর বংকম ও মাংতাং অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ম্রো ধর্মীয় পুরোহিতের মাধ্যমে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করা হয়।

সৎকার রীতিঃ- ম্রো পরিবারে কারো মৃত্যু হলে সেই মৃতদেহকে বাড়ীর ১টি বড় রুমে (কামরায়) রাখা হয়। মৃত ব্যক্তিকে দেখতে আসা লোকজন পরিবারের সামর্থ অনুযায়ী শুকর-মুরগী বধ করে ভাত খাওয়ানো হয়। সাতদিন পর নানা সামাজিক রীতি আচার অনুষ্ঠান শেষ করে মৃতদেহকে শ্মশানে নিয়ে দাহ করা হয়।

ম্রো আদি সংস্কৃতিঃ- ম্রোদের সংস্কৃতি আরকানীদের ভাবধারায় প্রভাবিত রয়েছে। তারা আরকানীদের মত ম্রাইমাব্দ অনুযায়ী চাংক্রান উদযাপন করে থাকে। মারমাদের মত ম্রোরাও বাংলা নববর্ষের দিন চাংক্রান চিং বা পিয়োনী, তৃতীয় দিনকে অর্থাৎ শেষ দিনকে চাংক্রান-চুরনি বলে থাকে। স্বজাতি ছাড়া অন্য সম্প্রদাযের কাছে এরা মুরুং নামে পরিচিত। ম্রো নৃ-গোষ্ঠি সর্বপ্রাণবাদী। তাদের কোন ধর্মগ্রন্থ নেই। ম্রোদের ধর্মাচারে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তবে ইদানিং ম্রোদের কিছু অংশ খ্রিষ্টান ও ক্রামা ধর্মের অনুসারী হতে শুরু করেছে।

ম্রো নৃ-জনগোষ্ঠির প্রধান ধর্মীয় উৎসবে মধ্যে রয়েছেঃ- ‘গো’ হত্যা তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। অপদেবতার হাত থেকে রক্ষা পেতে তারা এখনো গরু, শূকর, মোরগ হত্যা, পাছ, পাথর, খাল, পাহাড়ী ঝড়া, জলাশয় ইত্যাদিতে বলি দেয় এবং মানত ও পুজা করে। ম্রোরা তন্ত্রমন্ত্র, বৈদ্যালি, তাবিজ-কবচ ও তান্ত্রিকতাকে বিশ্বাস করে মনেপ্রাণে।

সামাজিক উৎসবঃ- জুম উৎসব ও চাংক্রান চিং বা পিয়োনী উৎসব পালন করে থাকে।

আদি সংস্কৃতি গুলো হচ্ছেঃ- বাঁশের বাশি, সংঘবদ্ধ নৃত্য, আনন্দ নৃত্য, চাংক্রান ওয়ান, চাংক্রান চিং বা পিয়োনী ও চাংক্রান চুরনী। তাদের মাতৃভাষায় রচিত বিভিন্ন গান। বান্দরবানে অন্য আদিবাসী গুলোর চেয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে অনগ্রসরতার কারণে চাকরি ও অন্যান্য পেশায় ম্রোদের অবস্থান নগন্য বলে চলে। তবে সম্প্রতি ম্রো বর্ণমালা আবিষকারের পর তারা শিক্ষা-দীক্ষায় ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে।

গো হত্যাঃ- বছরের যে সময়ে জুমের ফসল তোলার উৎসবের এই দিনে ম্রোরা গো হত্যা অনুষ্ঠান করে থাকে। গো হত্যার সময় একটি গরুকে চারিদিকে খাচার মধ্যে বন্দি করে রাখা হয়। এরপর দলবদ্ধ ভাবে খাঁচার চারিদিকে ঘুরে ঘুরে গরুটির উপর বিশেষ কায়দায় তৈরি বর্ষা নিক্ষেপ করতে থাকে। এভাবে বর্ষা নিক্ষেপ করে গরুটিকে হত্যা করা হয়। এ সময় ম্রো পুরুষরা ‘প্লং’ বাঁশের বাঁশি বাজিয়ে থাকে এবং মেয়েরা ফুল সজ্জিত হয়ে ‘ক্লবং প্লাই‘ পুষ্প নৃত্য করে থাকে।

চাংক্রান চিং বা পিয়োনী উৎসবঃ- চাংক্রানের মূল উৎসবের দিন। এদিনে পাহাড় থেকে তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরীরা ফুল তোলে। রাতে ঘরে ঘরে পিঠা ও ভালো খাবারের আয়োজন করা হয়। সকালে কিয়াং ফুল সজ্জিত করে ‘প্লং’ বাঁশের বাঁশি বাজিয়ে ‘ক্লবং প্লাই‘ (পুষ্প নৃত্য) করতে করতে কিয়াং পদক্ষীণ করে। ম্রোদের সমাজে ‘টাকেত‘ (লাঠি খেলা) অত্যন্ত জনপ্রিয়। চাংক্রানের মূল দিনে এই খেলা হয়ে থাকে। টাকেত খেলোয়াড়দের শৌর্য্য প্রদর্শনে সমস্ত ম্রো পাড়াকে আন্দোলিত করে।

চাংক্রান চুরনীঃ- চাংক্রানের শেষ দিন বা বিদায়ের দিন। এদিনে আবারো ফুল সংগ্রহ করে কিয়াং ফুল দিয়ে উপাসানা করা হয়। সারাদিন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিনের শেষে চাংক্রানও বিদায় নেয়।

© ২০১৫ বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ (বিএইচডিসি)