Marma

মারমা শব্দটি (ম্রাইমা) শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। মারমা নৃ-গোষ্ঠিরা বাংলাদেশের পাশ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার এর পেগু ডিভিশন থেকে(বার্মা) থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছে। মিয়ানমার ভাষায় মারমা শব্দটি অর্থ (ম্রাইমা)। কথা বলার ক্ষেত্রে মারমাদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও লেখার ক্ষেত্রে তারা বার্মিজ বর্ণমালা ব্যবহার করে থাকে। জানা গেছে, মোয়ে ম্রাইমা শংকর মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভুত জাতি এবং ভোট বর্মী ভাষা গোত্রের উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা গোষ্ঠীভূক্ত| এরা হীনযানী মতবাদী বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। মারমা সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক। তথ্যনুসন্ধ্যানে মারমাদের ১০টি গোত্রের উপস্থিত পাওয়া গেছে। গোত্র গুলো হচ্ছে-রিগ্যেসা বা খ্যংসা, কক্‌দাইংসা, মারোসা, ক্যক্‌ফ্যাসা, ফ্রাংসা, থংসা, প্যালেঙসা, ওয়ইংসা, মুরিখ্যংসা, লংদুসা।

জীবন জীবিকাঃ- মারমারা জুম চাষ ও চাষাবাদের মাধ্যমে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এদের ৯৯% মানুষ জুম চাষ ও পাহাড় ও বনজ সর্ম্পদের উপর নির্ভরশীল । জুম চাষ ও চাষাবাদ বিভিন্ন কাজে সকল আদিবাসী মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে এগিয়ে। তারা পুরুষদের চেয়ে বেশি পরিশ্রমী। তাই আদিবাসী মারমা সমাজে মেয়েদের সমমান বেশি। জুম চাষ,চাষাবাদ,পরিবারে ও সংসারে কাজও করে থাকে। এসব কাজের ফাঁকে এরা কাপড় বুনাসহ হাতের তৈরি নানা কাজ করে থাকে। আদিবাসীরা বেশি ভাগ তাদের হাতে তৈরি পোষাক পড়ে থাকে।

মারমা রীতিনীতি, জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহঃ- জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ এ তিনটি অধ্যায়কে মারমারা তাদের সামাজিক রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজসিদ্ধ(আবদ্ধ) করেছে। মারমারা এ সকল রীতিনীতি,আচার-অনুষ্ঠান মেনে চলে। মারমা সমাজের বিভিন্ন গোত্র ও উপ-গোত্রের যেসব রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে কিছু কিছু ব্যতিক্রম ও সূক্ষ তারতম্য রয়েছে। রীতিনীতি অনুসরণ ও আচার-অনুষ্ঠান মেনে চলার বাধ্যবাধকতা মারমা সমাজে রয়েছে।

বিবাহঃ- মারমা ছেলে-মেয়েরা যখন যৌবনে পদার্পণ করে এবং বিবাহের সময় হয় তখন (লাকপাইং ছোয়ে) অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি মূলত আয়োজন করা হয় আত্নীয়স্বজন,বন্ধু-বান্ধব,পাড়াপ্রতিবেশীদের জানানোর জন্য। প্রথমে পাত্রপক্ষ থেকে কনেপক্ষেকে প্রস্তাব দেয়। পাত্রপক্ষের প্রস্তাব মেয়ে কনেপক্ষের সমমতি এ দুটি বিষয় সমাজের নিয়মিত ও সামাজিক বিবাহের প্রথম পর্ব। উভয়পক্ষের সমমতি পেলে সামাজিক রীতি অনুসারে পাত্রের পিতা-মাতা বা বন্ধু-বান্ধব কয়েকজন বয়বৃদ্ধ প্রথাগতভাবে ব্যবহার্য উপকরণ যেমন- ১ বোতল মদ,২৫টি সুপারী,১বিড়া পান,বিন্নি ভাত,মিষ্টি চিনি, আঁখ,১ জোড়া নারিকেল নিয়ে কনেরবাড়িতে যায়। এসব উপকরণ কনের মা-বাবাকে প্রদান করে বিয়ের প্রস্তব দেন এবং মা-বাবার সমমতির পর মেয়ের মতামত নেয়া হয়। মেয়ের মতামত পাওয়ার পর পাত্রীপক্ষ অনুরূপ আর এক বোতল মদ পাত্র পক্ষকে দেয়া হয়। এরপর জ্যোতিষ ডেকে রাশিফল ও বিয়ের দিন ক্ষণ ও তারিখ ঠিক করা হয়। সবকিছু শুভ লক্ষণযুক্ত হলে। এসময় পাত্রপক্ষ একটি থামী (মেয়েদের কাপড়),রূপা বা স্বর্ণের একটি আংটি দিয়ে পাত্রীকে আশীর্বাদ করেন। বিয়ের ২দিন পূর্বে পাত্রের বাবা বা অভিভাবক নিজ বাড়িতে গৃহ দেবতা উদ্দ্যেশ্য (চুং মং লে) পুজার আয়োজন করে। পূজাতে দেবতার উদ্দেশ্যে ১টি শুকর. পাঁচটি মুরগী বলি দেয়া হয়। বিয়ের তারিখ ধার্য্য হলে পাত্রপক্ষ থেকে পাত্রীপক্ষের বাড়িতে ১টি মোরগসহ বিয়ের নিমন্ত্রণ পাঠানো হয়। বিয়ের দিন সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি অনুসারের পাত্রের বাড়ি প্রবেশ দ্বারে কলা গাছের ২টি কচি,সাদা সুতা দিয়ে পেচানো ২ টি পানি ভর্তি কলস (রিজাংও) ও সিফাইক্‌ও। বউ আনতে যাওয়ার সময় সিদ্ধ মোরগ,মদ তৈরি হওয়ার পূর্বে ভাত,পানি মুলির সংমিশ্রণ ১ বোতল মদ,১টি থামি (মেয়েদের নিম্নাংশের পরিধেয় কাপড়),১ টি বেদাই আংগি (উর্ধাঙ্গের পোষাক) সহ নানা উপকরণ নিয়ে যাওয়া হয়। বিয়ের দিন সিদ্ধ মোরগটিকে প্রয়োজনীয় উপকরণ মিশিয়ে খাওয়ার করে বন-কনের জন্য একটি পাত্রে পরিবেশন করা হয়। বিবাহ অনুষ্ঠানে বৌদ্ধ ভিক্ষু দ্বারা পঞশীল গ্রহণ এবং মঙ্গল সূত্র পাঠ,পিন্ড দানসহ নানা ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। মারমা সমাজসিদ্ধ বিবাহে লাক্‌ ছং চা-চ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয় মেতে ছারা এর নেতৃত্বে | তিনি সমাজ স্বীকৃত বিবাহদাতা| উল্লেখ্য, বৌদ্ধ ভিক্ষু বর-কনেকে বিবাহ দেন না তবে আর্শীবাদ দেন এবং বর-কনের আত্মীয়-স্বজন, মুরুব্বীগণ, বিবাহ প্রদান অনুষ্ঠানে এসে বর-কনেকে আর্শীবাদ দেন প্রথাগত বিবাহ রীতি অনুসারে| মেতে ছারা কলাপাতায় পেচানো সিদ্ধ করা আস্ত মুরগীর একটি চোয়াল টেনে বের করে নিয়ে পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ(চাইগা প্রদর্শন পূর্বক নব-দম্পতির বিবাহ জীবনের সুখ সমৃদ্ধির ভবিষদ্বাণী প্রদান করেন।এটা মেতে ছারার কাজ| এরপর থেকে তারা স্বামী-স্ত্রী রূপে সমাজে স্বীকৃতি লাভ করে ।

মারমাদের আদি সংস্কৃতিঃ- মারমা সম্প্রদায় সাংগ্রাই পোয়েঃ ও সাংগ্রাইং,ওয়াছো পোয়েঃ,ওয়াগ্যোয়াই পোয়েঃ,পইংজ্রা পোয়েঃ ফানুস বাতি উড়ানো, জলকেলি, বৌদ্ধমূতি স্নান, রথযাত্রা এ সবকে প্রধান সামাজিক উৎসব হিসেবে পালন করে থাকে। মারমাদের আদি সংস্কৃতি মধ্যে রয়েছে, থালা নৃত্য,পাখা নৃত্য,মাছ ধরা নৃত্য,পাংখুং,জাইক,কাপ্যা প্রভৃকি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মারমা সমাজে জনপ্রিয়। এদের মাতৃভাষায় রচিত বিভিন্ন গান যেমন রদু, সাখ্রাং, সাইবক, সাইগ্যাইক, হাইছোয়া, লুংদী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। প্রকাশ থাকে যে, বর্তমানে মারমা আধুনিক গান, পপ রক ব্যান্ড গানসহ ধর্মীয় গান এর সিডি ক্যাসেট পাওয়া যায় । মারমা আদি সংস্কৃতির বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে আছে বুং, পাই, হ্নে, পাইতলা, প্রি, খেখ্রং, চেহ প্রভৃতি। মারমারা বর্ষবরণকে প্রধান সামাজিক উৎসব হিসেবে পালন করে থাকে। এ বর্ষবরণকে মারমা তাদের ভাষায় ‘সাংগ্রাই পোয়েঃ বা সাংগ্রাইং উৎসব বলে থাকে। ব্যাপক আয়োজনের মাধ্যমে এ উৎসব পালন করে মারমারা। বাংলা নববর্ষ থেকে মারমাদের সাংগ্রাই পোয়েঃ উৎসব শুরু হয়। মারমারা এ উৎসব ৪দিন ব্যাপী পালন করে থাকে।

© ২০১৫ বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ (বিএইচডিসি)