Lusai

লুসাই পরিচিতি: পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১১টি আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে লুসাই জনগোষ্ঠী। পার্বত্য চট্টগ্রামে লুসাইদের অবস্থান খুবই নগন্য। ১৯৯৯ সালে সরকারী আদম শুমারী অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে লুসাই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১০৯৮জন। এর মধ্যে ২০১১ সালের শুমারী অনুযায়ী বান্দরবানে রযেছে ৩৯৯ জন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিজোরামের লুসাই পাহাড়ে এলাকায় মূল জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। লুসাই পাহাড়ের নামেই তাদের নামকরণ হয়েছে। তাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ভারতের মিজোরামে বসবাস করছে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর তারা ব্যাপক সংখ্যক লুসাই পার্বত্য চট্টগ্রাম ত্যাগ করে ভারতের মিজোরামে চলে যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে লুসাই বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে একাধিক অভিযান চালায়।  ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে এবং ১৮৯২ সালে খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সর্ব বৃহৎ লুসাই অভিযানের পরবর্তী সময়ে নানা প্রতিকূলতার মূখে পার্বত্য চট্টগ্রাম যাযাবর জীবনযাপনকারী লুসাই জনগোষ্ঠীর অনেক পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মিজোরাম রাজ্যের একাংশ নিয়ে গঠিত লুসাই হিলস্‌ ডিষ্ট্রিক্ট-এ স্থায়ী ভাবে বসবাস করতে বসতি গড়ে তোলে।কিছু অংশ বর্তমানে তিন পার্বত্য জেলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছে। এদের বসবাস মূলত রাঙ্গামাটির সদরের বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে উপত্যকায় এবং বান্দরবানের জেলা সদর ও রুমায়। লুসাইরা জাতিগতভাবে মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীভূক্ত। এ অঞ্চলে বসবাসরত লুসাইরা টিবোটো-বার্মেন শাখার কুকি-চীন দলের মধ্যে কুকি-চীন উপদলের অন্তর্গত ভাষাভাষি মানুষ। বর্তমানে লুসাইরা খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী। খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণের আগে তারা সর্বপ্রাণবাদে বিশ্বাসী ছিল। লুসাই জনগোষ্ঠীর একজন আদিবাসীর পুরুষের ঔরসে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিই লুসাই পরিচয়ের অধিকারী। লুসাই জাতিসত্বার অন্তর্ভূক্ত কোন পরিবারের জন্মগ্রহণকারী শিশুর সামাজিক পরিচিতি লুসাই বলেই স্বীকৃত হবে। তবে মাতাকে লুসাই নারী হতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

জীবন জীবিকাঃ- এসব লুসাই নৃ-গোষ্ঠী পাহাড়ে বসবাস করে তারা জুম ও চাষাবাদ এবং পাহাড়ী বনজ সম্পদের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। আর যারা শহরের বসবাস করে তারা বিভিন্ন পেশার মাধ্যমে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে থাকে ।

লুসাই জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহে সামাজিক বাধ্য বাধকতা ও রীতিনীতি আচার-অনুষ্ঠানঃ- জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহে এই তিন অধ্যায়কে লুসাই জনগোষ্ঠী সামাজিক ও রীতিনীতি আচার-অনুষ্ঠানের দ্বারা সমাজসিদ্ধ করেছে। এসব রীতিনীতি আচার-অনুষ্ঠান লুসাই সমাজে অলঙ্ঘনীয় করা হয়েছে।

শিশুর জন্মশুদ্ধি ও আচার-অনুষ্ঠানঃ- আদিবাসী লুসাই পরিবারে জন্মের ৩ দিন পর আত্ময়ীস্বজনকে নিমন্ত্রণ দিয়ে ১টি গয়াল বা ১টি শুকর বধ করে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা। এ অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাড়ির সামনে একটি লম্বা পরিপক্ক গাছে ‘সার অংশটি মাটিতে পুঁতে রাখা হয়। অনুষ্ঠানে লুসাই দম্পতির প্রথম সন্তানের বেলায় পিতৃকুলের পিতামহ-পিতামহী নামকরণ করেন।

বিয়ের রীতিঃ- বিয়ের সামাজিক রীতি অনুসারে পাত্রপক্ষের তরফ হতে ‘পালায়’ (ঘটক) এর মাধ্যমে পাত্রীপক্ষের অভিভাবকের নিকট প্রস্তাব পাঠায়। পাত্রীপক্ষের সমমতি পাওয়া গেলে পাত্রীর পিতামহ অথবা তার অবর্তমানে পাত্রীর পিতার দাবী অনুসারে পাত্রপক্ষকে কনে পণ দিতে হয়। কনের পণ বাবদ গবাদি পশু অথবা সমমূল্যের টাকা প্রদান করতে হয়। এই পণ দিতে ব্যর্থ হলে পাত্রের ঐরসজাত পুত্র কিংবা নাতি পর্যন্ত কনে পণ পরিশোধ করতে বাধ্য থাকে। বিয়ের অনুষ্ঠানে বর এসে ‘ইননেহ্‌য়না’ সম্পন্ন করে। অনুষ্ঠানের একমাস পর বর-কনের দেখা এবং বরের বাড়িতে বউ নেয়া হয়। বর্তমানে খ্রিষ্ট ধর্মীয় রীতি অনুসারে চার্চে ‘বান’ প্রকাশে লুসাই পাত্র-পাত্রীর বিবাহ হয়।

সৎকার রীতিঃ- লুসাই সমাজে কারো মৃত্যু হলে গ্রামবাসী সবাই মৃতের জন্য শোক প্রকাশ করতে হয়। লুসাই সমাজে মৃত্যুর পর মৃতদেহ কবর দেয়া হয়। সমাজের আদি রীতি অনুসারে মৃতের আত্নারউদ্দেশ্যে পশু বলি দিয়ে ভোজের আয়োজন করা হয়। তরে বর্তমানে যারা খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণের পর এ প্রচলন এখন নেই। খ্রিষ্ট ধর্মীয় রীতি অনুসারে কবর দেয় এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়।

লোকবিশ্বাসঃ- লুসাই জনগোষ্ঠী লোকবিশ্বাস তাদের কারো মৃত্যুর পর মৃতের আত্না ‘মিথিখুয়া’ নামক মৃতপূরীতে বাস করে। মিথিখুয়াতে অবস্থানকালে প্রত্যেকের নিজ নিজ কর্মফলের বিচার হবে। কর্মফল অনুসারেই তারা স্বর্ণে (পিয়াল রাল) যেতে পারবে। পৃথিবী ছেড়ে মিথিখুয়াতে যাবার মান হিসেবে (থি টিন থ্‌লা) আগষ্ট মাসকেই ধরা হয়। তাই লুসাই সমাজে আগষ্ট মাসে কোন বিয়ের অনুষ্ঠান বা বিনোদনমূলক উৎসব করা হয় না। বর্তমানেও এ রীতি মানা হয়। লুসাইরা আদিতে সৃষ্টিকর্তা বা পাথিয়েল বিশ্বাস করতো। লুসাই জনগোষ্ঠী এককালে জড়োপাসক ও সর্বপ্রাণবাদের বিশ্বাসী ছিল। তারা ভূতপ্রেত, অপদেবতা ইত্যাদি বিশ্বাস করতো। তারা ভূতপ্রেত ও অপদেবতা উদ্দেশ্যে পশুদিয়ে শির পূজা ও নদী পুজা দিত।

লুসাই নৃ-জনগোষ্ঠির আদি সংস্কৃতিঃ- লুসাই সম্প্রদায়ের আদি সংস্কৃতি ও উৎসবের মধ্যে রয়েছে, চাপচার কুট, মিনকুট, পাল কুট। তাদের মাতৃভাষায় রচিত বিভিন্ন গান ও আদি নৃত্য। মনকুট উৎসব- জুমের ঘাস কাটার যখন শেষ হয় তখন এই উৎসব করা হয়। চাপচার কুট- এটি নবান্ন উৎসব। জুমের ধান কাটা শেষ হলে এই উৎসব করা হয়।

© ২০১৫ বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ (বিএইচডিসি)