Chakma

চাকমা পরিচিতিঃ- চাকমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমনের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া না গেলে ও ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ও পার্বত্য চট্টগ্রামে আদের বসবাসের বিভিন্ন প্রমান পাওয়া যায়। নদী পাড়ে ও পাহাড়ের ওপরে বেশ খোলামেলা জায়গায় চাকমারা বসবাস করতে ভালো বাসে। তাই তাদের বেশি ভাগ লোকজনকে নদীর পাড়ে ও পাড়ের খোলামেলা জায়গায় বসবাস করতে দেখা যায়। জানা গেছে, চাকমারা মঙ্গোলীয় নৃ-গোষ্ঠীভূক্ত। চাকমাদের নিস্বজ ভাষা ও বর্ণমালা রয়েছে। এগুলো ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবারভূক্ত। চাকমাদের ভাষার সাথে বাংলা ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার সাথে প্রচুর মিল রয়েছে। তবে তুলনামূলকভাবে অহম বা অসমিয়া শব্দের প্রচলন বেশি রয়েছে। এরা আদি বৌদ্ধধর্মাবলম্বী জাতি। এদের অনেকেই প্রকৃতি পূজায়ও বিশ্বাস করে। চাকমারা বিভিন্ন গঝা ও গুত্তিতে বিভক্ত একটি অভিন্ন জাতিসত্ত্বা হিসেবে পরিচিত। চাকমাদের গঝা নাম গুলো হচ্ছে- (আ) ১. আঙু গঝা, (উ) ২, উসসুরী, (ও) ৩. ওয়াংঝা, (ক) ৪. কাম্ভে (বড়), ৫. কাম্ভে (গুড়া), ৬. কুদুগ (সজারু). ৭. কুরকুট্যা/কুরকুজ্যা, (খ) ৮. খ্যাংজয়/খ্যাংজে, (চ) ৯. চাদঙঅ, ১০. চেক-কপঅ, ১১. চেগে (দুঃখ্যা), (ত) ১২. তেইয়া, ১৩. তৈন্যা, (দ) ১৪. র্দায্যাসহ মোট ৩৩ টি গঝার নাম রয়েছে। গুত্তির নাম গুলো হচ্ছে- ১. মগ ও ইহ্‌লিয়া ২. তিবিরা ৩. কালা, কাঙারা, রাঙা, কাঙারা ৪. দ্যায়া, অংগ্যা, হ্লাধিঞা ৫. মেন্দর, মারেয়া, গজাল্যা, লোপাত্তো ৬. সর্দার ৭. নেন্দার, অঙরে, নন্দদেব, পীড়াভাঙা, ফিয়িয়াংজা, ভবা, নাবান, লরকস্যা, নাঙজআনা, তদেগা, সুরসুরি, সাঙাদা, পচা, আগুনপুন, পেজার, সর্দার, ভঞ্যা, হৃাদিঙা, রাজাকারা, উগুরেং ৮. চৈয়দনী, দোয়াজা, নাপিতা, সেহ্‌ম, চকই, বাঙালি, কবালা, তিবিয়া ৯, সর্দায্যা (বড়), রুয়াসিয়া, সাততঙ্যা, গুড়া সর্দয্যা বা কুরপা পাগালা ১০. ধুর্য্যা, মেন্দর, চার্য্যা, বগা, রোয়া, খেহলঅ ১১. কাঙারা, বগিলা, ভুলং, ভুরঙঅ, নিনাঙ্যা, থামালা, পীড়াভাঙা, আহ্‌পাবা ১২. পুইজগা, ফাদেঙা ১৩. কুজ্যা. উর্য্যা, ধামমুয়া, মলিয়া, মেন্দর ১৪. নাদুকতুয়া, কঙরে, কলাসহ ৩৩টি গুত্তির নাম রয়েছে। চাকমারা জুম চাষ ও চাষাবাদের মাধ্যমে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

জীবনজীবিকাঃ- চাকমারা জুম চাষ ও চাষাবাদের মাধ্যমে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এদের ৯৯% মানুষ জুম চাষ ও পাহাড় ও বনজ সর্ম্পদের উপর নির্ভরশীল। জুম চাষ ও চাষাবাদ বিভিন্ন কাজে সকল আদিবাসী মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে এগিয়ে। তারা পুরুষদের চেয়ে বেশি প্ররিশ্রমী। জুম চাষ, চাষাবাদ ও ঘর-সংসারে কাজও করে থাকে।

চাকমাআচার-অনুষ্ঠান,রীতি নীতি, জন্ম, মৃত্যুও বিবাহঃ- প্রথমে পাত্র ও পাত্রীপক্ষ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ‘বৌ হজা যেয়ে’ (বৌ আনার দল) ও ‘বৌ বারে দিয়া’ (বৌকে বরের বাড়ী পৌছানো) দলের সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ করে নেয়। এ দলের মধ্যে তরুণ-তরুণীর সংখ্যায় বেশি থাকে। উভয় দলের বাকী সদস্যদের মধ্যে বয়স্ক পুরুষ ও মহিলা, যারা বর ও কনের প্রভাবশালী ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এ গুলো মধ্যে রয়েছে সাবালা, বৌ আদনি (কনের পথ প্রর্দশক) ও ‘ফুর বারেং বুগনি’ (কনে সাজানোর পোশাক ও অলংকারাদি বহনের জন্য কারুকার্যময় ঝুড়ি বহণকারী)।কনেনিজবাড়ীতেবরেআত্মীয় স্বজনরা পৌছালে কলসির উপর রাখা মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং বধুবরণেরঅনুমতি দেয়া হয়।অনুমতিপাওয়ার পর বরেরছোটভাই বা বোন ওনিকট আত্মীয়একজন ছেলেবামেয়ে বাড়িরমুলপ্রবেশ পথে একটিপিড়িঁ পেতে কনের পা ধুইয়েদেয়। এরপর বরেরমা অন্য একজন বয়স্ক মহিলা প্রবেশ পথের দুইপাশে রাখা দুটি কলসির (মঙ্গল কলসি) গলায় বাধা সাত প্রস্থ সুতা কেটে কনের বাম হাতে কনিষ্ঠ আঙ্গুলে বেধেঁ দেয় এবং বৌকে ফুল ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। চাকমা সমাজের মূল বিয়ের অনুষ্ঠান হলো চুমুলাং। চুমুলাং (দেবতা-দেবী পূজা) অনুষ্ঠান একজন ওঝা বা পুরোহিতের মাধ্যমে করা হয়। চুমুলাং এর সময় একই বেদীতে ২টি পূজার ঘাট বসানো হয়। বরের জন্য নির্দিষ্ট সামমুয়াতে চাল ও কনের জন্য ধান দেওয়া হয়ে থাকে। ‘সামমুয়া’ হচ্ছে বাশঁ-বেতের তৈরী ঢাকনাযুক্ত একটি পাত্র বা তুরুং (ঝুড়ি)। চুমুলাং পূজার সময় একটি শুকর, ৩টি মুরগী ও মদ উৎসর্গ করা হয়। চুমুলাং পূজার মাধ্যমে নবদম্পতির দাম্পত্য জীবন শুরু করে। বিয়েতে চাকমারা বিভিন্ন সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান করে থাকে। এ গুলো হলো ভোজনের আয়োজন, খানা সিরানা বা খানা সিরেদেনা, দায়-শোধসহ নানা অনুষ্ঠান‘ ঘরজামাই তুলে বিয়ের রীতি ও চাকমা সমাজে রয়েছে।

সৎকার রীতিঃ- চাকমা সমাজে কারো মৃত্যু হলে মরদেহ সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়। এ সময় বিশেষ তালে টোল বাজানো হয় এবং ঘরে সদর দরজায় মাটির পাত্রে তুষের আগুন রাখা হয়। এর পর মৃতদেহকে স্নান করিয়ে দেয়া হয়। এ সময় বৌদ্ধ পুরোহিত ডেকে এনে মৃতের আত্মীয়স্বজন মঙ্গল সূত্র শ্রবণ করেন। মৃতের আত্মার শান্তি কামনা করে আত্মীয়স্বজন টাকা-পয়সা দান করে থাকেন। মৃতদেহকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাশঁ দিয়ে বিশেষ কায়দায় ‘আলং’ শবাধার তৈরী করে। শ্মশানে নেয়ার পূর্বেশবের মূখে সাতটি অন্ন পিন্ড ছোয়ানো হয়। এরপর মৃতের পায়ের কনিষ্ঠ আঙ্গুলে সাত লহড় বিশিষ্ট সুতার একটি প্রান্ত বেঁধে অপর প্রান্তটি ১টি মুরগীর বাচ্চা আঙ্গুলে বাধা হয়। আত্মীয়স্বজনরা মুরগী বাচ্চা ধরে রাখে। এ সময় ওঝা আত্মীয়স্বজনদের জিজ্ঞাসা করে মৃত ও জীবিতগণকে পৃথক করে দেবার সমমতি আছে কি? আত্মীয়স্বজন বলে (আঘে-আঘে) অর্থাৎ আছে আছে। এর সুতা কেটে ছিন্ন করা হয়। মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাবার জন্য রওনা হলে পরিবারের ঘরের যাবতীয় পানি ও চুলার ছাই বাইরে ফেলে দেয়া হয়। মৃতদেহ সাথে একটি পুটলীতে ভাত ও অন্যান্য খাদ্য বেঁধে দিয়ে শ্মশানে নিয়ে যায়। এ সময় মৃতের পা বাড়ি দিকে থাকে। এটি বাড়ি থেকে মৃতের শেষ যাত্রার প্রতীক। দাহ করার আগে মৃতের সাথে বেঁধে দেয়া খাদ্য শেষবারে মত তার মূখে ছোয়ানো হয়। পুরুষ হলে চিতায় পাঁচস্তর ও স্ত্রীলোক হলে সাত স্তর লাকড়ি সাজানো হয়। এর পর (শবাধার) আলংসহ চিতায় চারিদিক পুরুষ করে ৫ বার ও স্ত্রীলোক হলে ৭ বার ঘুরানো হয়। এ সময় প্রতিবারেই ‘আলং’কে চিতার সাথে ষ্পর্শ করে মৃতদেহ চিতায় তুলে দেয়া হয়ে থাকে। মৃতের জ্যেষ্ট পুত্র বা রক্তের নিকটাত্মীয় চিতায় আগুন দেয়ার পর অন্যান্যরা অগ্নি সংযোগ করে। আগুনের পুড়ে যাওয়ার পর চিতা থেকে হাঁড় ও কিছু ছাই নিয়ে একটি নতুন মাটির হাঁড়িতে রেখে সাদা কাপড় দিয়ে হাড়ির মুখ ঢেকে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এরপর সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান শেষ করা হয়। এভাবে সৎকার রীতি পালন করে থাকে চাকমা জনগোষ্ঠির লোকজন।

চাকমাদের আদি সংস্কৃতিঃ- চাকমা সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসব ও আদি সংস্কৃতি মধ্যে রয়েছে, বিঝু, ফুলবিঝু, মূলবিঝু ও গর্যাপর্যা, নুয়াভাত, চামনী অনা, ফানাচ বাত্তি উড়ানা, আহল পালনী, ব্যুহ চক্র, কঠিন পূর্ণিমা, বৈশাখী পূর্ণিমা, ওয়াধরানা ও ওয়াভাঙানা। তাদের মাতৃভাষায় রচিত বিভিন্ন গান। এরমধ্যে চাকমারা বর্ষবরণকে ব্যাপক অনুষ্ঠানমালার মধ্যে দিয়ে পালন করে থাকে। বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী বছরের শেষ ২দিন ও নববর্ষের প্রথম দিন ‘বিঝু’ পালন করে থাকে। চৈত্র মাসের ২৯ তারিখ ফুলবিঝু ও চৈত্রের শেষ দিনে মূলবিঝু এবং বছরের প্রথম দিনকে তারা গর্যাপর্যা দিন বলে থাকে।

© ২০১৫ বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ (বিএইচডিসি)