Chak

চাক পরিচিতিঃ- চাক আদিবাসী মূলত মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর্ভক্ত একটি দল। আরাকানীরা এদেরকে ‘সাক’ বা মিংসাক’ বলে থাকে। চাক শব্দের অর্থ দাঁড়ানো| ভারতের মণিপুর রাজ্যের অধিবাসী আন্দ্রো জনগোষ্ঠীর ভাষার সাথে চাক আদিবাসীদের ভাষার ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে। চাকদের নিজস্ব ভাষা ‘তু’ এরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। চাকদের বিবাহের প্রথা গোষ্ঠী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। আদিবাসী মারমাদের সাথে চাক আদিবাসীদের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান গুলোর অধিকাংশেই মিল রয়েছে। চাক আদিবাসীরা প্রাচীনকালে মিয়ানমারের ইরাবর্তী নদীর উৎসস্থলের দিকে বসবাস করতো। চাকরা প্রথামে চীন থেকে এসে ভারত মিজোরাম ও মিয়ানমারে সীমান্তবর্তী এলাকা গুলোতে বসবাস করতে শুরু করে। চাক জনগোষ্ঠীর বসবাস বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা ও মিয়ানমান সীমান্ত এলাকায়। এছাড়াও অপর দুই জেলা রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে স্বল্প সংখ্যক চাক জনগোষ্ঠী লোকজন চাকরীর সুবাদে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করছে। জানা গেছে, চাক জনগোষ্ঠীভূক্ত একজন আদিবাসী পুরুষের ঔরসে তাকে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিই চাক পরিচয়ের অধিকারী। চাক জাতিসত্ত্বার অন্তর্ভূক্ত কোন পরিবারে জন্মগ্রহণকারী শিশুর সামাজিক পরিচিতি চাক বলে স্বীকৃত হবে। তবে মাতাকে চাক নারী হতে হবে এমন কোন সামাজিক বাধ্যবাধকতা নেই। চাক জনগোষ্ঠীর গ্রামীণ সমাজে দেবতা, অপদেবতা, প্রকৃতি পূজার প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। এরূপ পুজার প্রচলনকে সামাজিক বিশ্বাস হিসেবে গণ্য করা হয়। পারিবারিক সুখ-শান্তি ও মঙ্গলের জন্য লক্ষ্মীপূজা অথাৎ ‘আংদা ইছা ওহে’ (আংদা ওহেক) অনুষ্ঠানের প্রচলন চাক সমাজে রয়েছে। এ পূজা দিতে একটি শুকর প্রযোজন হয়।

জীবন জীবিকাঃ- চাক নৃ-গোষ্ঠীর প্রধান পেশা কি তা সঠিক ভাবে জানা না গেলে ও পার্বত্য জেলা গুলোতে বসবাসরত চাকরা জুম ও চাষাবাদের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহে সামাজিক বাধ্যবাধকতা ও রীতিনীতি আচার-অনুষ্ঠানঃ- চাক জনগোষ্ঠী জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহে এই তিনটি অধ্যায়কে সামাজিক ও রীতিনীতি আচার-অনুষ্ঠানের দ্বারা সমাজসিদ্ধ করেছে। চাক সমাজে এসব রীতিনীতি আচার-অনুষ্ঠান মেনে চলা হয়।

শিশু জন্ম ও সামাজিক আচারঃ- চাক জনগোষ্ঠী জন্মান্তরবাদ জ্যোতিষতত্ত্ব বিশ্বাস করে। পূর্ব পুরুষদের কেউ নবজাতক হয়ে জন্মগ্রহণ করেছে এমন বিশ্বাস থেকে সেই পূ্‌র্ব পুরুষের নামানুসারে নবজাতকের নাম রাখা হয় । আবার অনেকে জ্যোতিষ শাস্ত্র বিচার অনুসারে শিশুর নাম রাখে। চাকদের প্রথম সন্তানের নামের আগে বা পরে ‘উ’ এবং সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের নামের আগে বা পরে ‘থুই‘ শব্দ ব্যবহার করা হয়। চাক সমাজে শিশু ভূমিষ্ট হবার সময় প্রসূতিকে ঘরের আলাদা একটি কক্ষে (কাবাক বা আতং ঘরে) রাখা হয়। তবে ঘরটি স্বামী বা নিকটাত্মীয়ের ঘর হতে হবে। নয়তো প্রসূতির জন্য আলাদা ঘর নির্মান করে দিতে হয়। জন্মের পর ছ্‌রামাহ্‌ (ধাত্রী) শিশুকে এক টুকরা কাপড়ে জড়িয়ে স্নান করিয়ে দেয়। পরিবারে একজন বয়ষ্ক মহিলা ১টি পাত্রে কিছু ভাত ও পানি রেখে সেখানে ১টি অঙ্গলা (জ্বলন্ত কয়লা) ফেলে আতুর ঘরে নিয়ে যায়। সে পাত্রের পানিতে আঙ্গুল ভিজিয়ে নবজাতকের হাতে ও পায়ে ছোয়ানো হয়। পরে ভাত ও পানি এবং অঙ্গলা গুলো ঘরের বাহিরের ফেলে দিতে হয়। বিশেষ কক্ষে ৮/১০ দিন থাকতে হয়। নাভীরজ্জু শুকিয়ে যাবার পর যেদিন নবজাত শিশুকে আতুর ঘরের বাহিরে আনা হয় সেদিন শ্বাশুড়ি বা কোন বয়ষক মহিলা পবিত্র পানি প্রাকৃতিক উৎস ছড়া বা ঝর্ণা থেকে অন্য কেউ সপর্শ করার আগে ভোর বেলায় নিয়ে এসে প্রসূতি মা ও শিশুর উপর ছিটিয়ে দেয়। এ সময় ডিম পাড়া একটি মুরগী রান্না করে ধাত্রীকে নিমন্ত্রণ খাওয়ানো হয়। এ খাবার ধাত্রী ছাড়া অন্য কেউ খেতে পারে না।

বিয়ের রীতিঃ- চাক সমাজে বিবাহ উপলক্ষে বরপক্ষকে কনের বাড়িতে তিনবার যেতে হয়। প্রথমবারে পাত্রের পিতা-মাতা পাত্রীর পিতা-মাতার বাড়িতে মদ ও মুরগী নিয়ে যায়। এভাবে যাওয়াকে ‘আচংগা’ বলে‘ অর্থাৎ কনে দেখা বলে। দ্বিতীয়বারে জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী পাত্র-পাত্রী কুষ্টিতে জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত শুভাশুভ নির্ণয়ের বিবরণ যাচাই করে। তৃতীয়বারে একশ থেকে পাঁচশত ডিম উপঢৌকন নিয়ে পাত্রের মা-বাবা পাত্রীর বাড়ি নিয়ে গিয়ে বিবাহের দিন ধার্য করে। এসময় পাত্রীপক্ষ কনে পণ হিসেবে অলংকার, পোশাক-পরিচ্ছদ ও নানা সামগ্রী দাবী করে থাকে। বিয়ের অনুষ্ঠানের ২দিন আগে পাত্রীর বাড়িতে তার আত্মীয় স্বজনরা মিলিত হয়। বাড়ির উপস্থিত প্রবীণ ও বয়ষকদের উদ্দেশ্যে পাত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণাম করে সকলের আশীবার্দ কামনা করে। বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রবীণরা তাকে আশীবার্দ করে টাকা দেয়। বিয়ের দিন বরযাত্রীরা অলংকার, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং খিলি পান, মদ মুরগী, আঁখ, কলা ইত্যাদি সামগ্রী কনের বাড়ির আঙিনায় পৌঁছালে কনেপক্ষের একজন গিয়ে বরকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বাড়ির মাচাং ঘরে তুলে কনের কক্ষে নিয়ে গিয়ে কন ও বরকে পরসপরের মুখোমুখি করে বসানো হয়। তাদের সামনে বেতের তৈরি ২টি টেবিলে রাখা কলাপাতার উপর ভাত ও মদের গ্লাস এবং পাশে ২টি মদের বোতল দেয়া হয়। বরপক্ষের আনা ২টি মুরগীকে বিনা রক্তপাতে বধ করা সে ২টি পালক, নখ ও নাড়িভূড়ি ফেলে পরিস্কার করে ধুয়ে হলুদ মেখে আস্ত সিদ্ধ করা হতে হবে। এ মুরগী বর-কনে সামনে কলাপাতায় রাখা হয়। এর মুরগী জিবাহ টেনে বের করে শুভাশুভ নির্ণয় করা হয়। অনুষ্ঠানে শেষ পর্বে বরের সামনে রাখা গ্লাসে মদ ঢেলে বর নিজের মুখে কাছে নিয়ে ফুঃ ফুঃ শব্দ করে কনের হাতে তুলে দেয়। এ সময় কনে তা পান করে এবং একই ভাবে কনে গ্লাসে মদ ঢেলে নিজের মুখে কাছে নিয়ে ফুঃ ফুঃ শব্দ করে বরের হাতে তুলে দেয়। এ সময় বর তা পান করে। এখানেই বিয়ের মূল অনুষ্ঠান (মংনাঙ পো) সম্পন্ন করা হয়। সামাজিক রীতি অনুসারে মদ পান করে স্বামী-স্ত্রীরূপে স্বীকৃতি অর্জন করে।

সৎকার রীতিঃ- চাক সমাজে মৃতদেহ সৎকারের জন্য প্রচলিত নিয়ম বা রীতিকে ‘আপেংজা’ (দেহ অধিকার প্রথা) বলে। সমাজের রীতি অনুসারে মৃতদেহ দাহ্য করার দায়িত্ব যার উপর বর্তায় যদি সে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালন না করেন এবং অনুপস্থিত থাকেন তাহলে সমাজের কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হয়। চাক সমাজে কেউ মৃত্যু হলে তার আত্মার শান্তি কামনা করে ধর্মীয় পুস্তক পাঠ এবং ঢোল, মং ইত্যাদি বাজানো হয়। মৃত ব্যক্তিকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার আগে স্নান করানো হয়। মৃতদেহ বাঁশের খাটিয়াতে তুলে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে উপস্থিত সকলে বৌদ্ধ ভিক্ষুর কাছে পঞশীল গ্রহণ করে। এরপর মৃতদেহ উপর পবিত্র পানি ছিটিয়ে চিতায় তুলে দিয়ে অগ্নি সংযোগ করা হয়। এরপর মৃত ব্যক্তি এক বছর পূণ হবার আগে আত্মীয়স্বজন ও সমাজের লোকজনকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে হয়।

চাক নৃ-জনগোষ্ঠির আদি সংস্কৃতিঃ- চাক সম্প্রদায়ের আদি সংস্কৃতি ও উৎসবের মধ্যে রয়েছে, বৈসাবি, সাংগ্রাইং, ফাইতা, বুদ্ধ মূর্তি স্নান করানো, দুতিয়ারিযা, ওয়াঙ্গাবা। তাদের মাতৃভাষায় রচিত বিভিন্ন গান ও আদি নৃত্য। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চাকরা ৪/৫ দিন ধরে সাংগ্রাইং উৎসব পালন করে থাকে। চাকদের ভাষায় সাংগ্রাইংকে প্রথম দিনকে ফাইতার মারিয়া, দ্বিতীয় দিন দুতিয়ারিয়া, তৃতীয় দিন সাংগ্রাইংফু বলে থাকে। তারা এসব অনুষ্ঠান গুলো ব্যাপক আয়োজনের মাধ্যমে পালন করে থাকে।

© ২০১৫ বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ (বিএইচডিসি)