Bawm

বম নৃ-গোষ্ঠির পরিচিতিঃ- বম নৃ-গোষ্ঠিরা এদেশে এসে আদিকাল থেকে বান্দরবানের প্রথমে রুমা ও থানছি উপজেলার দূর্গম পাহাড়ী এলাকা গুলোতে বসবাস শুরু করে। এরপর আস্তে আস্তে সদর উপজেলার চিম্বুক, কানাপাড়াসহ রোয়াংছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বসবাস শুরু করে এবং পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলাতেও বম নৃ-গোষ্ঠির বসবাস রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১১টি আদিবাসীর মধ্যে বম নৃ-গোষ্ঠী ষষ্ঠ স্থানে রযেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বমদের জনসংখ্যা ১১,৬৩৭ জন। এটি ২০১১ সালে সরকারী আদম শুমারী অনুযায়ী। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বম নৃ-গোষ্ঠীর আদি নিবাস মিয়ানমারের ইরাবতী, মিজুরাম ও চিন্দুইন নদীর মধ্যবর্তী এলাকায় বলে ধারণা করা হয়। তবে বান্দরবানে সদরে বসবাসরত বম সম্প্রদায়ের লোকজনের সাথে আলাপকালে জানা যায়, তারা এদেশে প্রথমে মিজুমার থেকে এসেছে। ইতিহাসবেত্তাদের মতে বম নৃ-গোষ্ঠী চীনের চিনলুং পর্বতমালায় তাদেে আদি বসবাসস্থল ছিল। পরবর্তীতে তারা মিয়ানমারে চলে আসে। চিনলু অর্থ অসংখ্য পাথুরে পর্বতকে বলা হয়। বমদের আবাসস্থলে ও প্রচুর পাথর দেখা যায়। বমরা এক সময় প্রকৃতিপূজা করলেও বর্তমানে এরা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছে। ধর্মের প্রভাবে তাদের সামাজিক রীতিনীতি ও কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। আদিকালে তারা ঈশ্বরকে ‘খাজিং’ বলতো‘ তারা ‘কর্ণবুল’ নামে এক ভূতের পূজা করত। বম জনগোষ্ঠী কর্ণবুল পূজায় ভূতের উদ্দেশ্যে মুরগী উৎসর্গ করত। তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র ভাষা দেখা যায়। তারা লেখার সময় রোমান হরফে লেখে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বম সম্প্রদায় ২টি উপদলের শাখায় অন্তরর্ভুক্ত রয়েছে। সিনো-টিবেতান পরিবারের টিবেটো-বার্মেন শাখার কুকি-চীন। ইন্দো মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠির মধ্যে কুকি-চীন উপদল একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। উপদলের অন্তর্গত ভাষাভাষির হরো বন জনগোষ্ঠি। বম সম্প্রদায় ২টি শাখা অথবা গোত্রে বিভক্ত। এই ২টি গোত্রে মধ্যে ৫৮টি উপ-গোত্র রয়েছে।

জীবন জীবিকাঃ- জুম চাষ বম নৃ-গোষ্ঠীর প্রধান পেশা। তবে তারা শিকার প্রিয় জাতি। তবে বর্তমানে তারা আনারস, কমলা, পেঁপে, কলাসহ বিভিন্ন ফলজ বাগান করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বমদের উৎপাদিত আনারস, কমলা. পেঁপে ও কলা সবচেয়ে জনপ্রিয়। তারা জুম ও ফলজ বাগানের মাধ্যমে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে তাকে। বম নারীরা পুরুষদের চেয়ে বেশি পরিশ্রমী। তারা জুম ও সংসারের কাজের পাশাপাশি হস্তশিল্পের বিভিন্ন কাজ করে তাকে। পরিবারে বাড়তি আয় যোগাতে নারীরা হস্তশিল্পের কাজ করে থাকে। এসব হস্তশিল্প দেশী-বিদেশী পর্যটক ও বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

বম জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহে সামাজিক বাধ্যবাধকতা ও রীতি নীতি আচার-অনুষ্ঠানঃ- জন্ম, মৃত্যু. বিবাহ এ তিনটি অধ্যায়কে বম জনগোষ্ঠী তাদের সামাজিক রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের দ্বারা সামাজসিদ্ধ করেছে। এসব রীতি ও আচার-অনুষ্ঠানকে বম সমাজে অলঙ্ঘনীয় করা হয়েছে।

শিশুর জন্মশুদ্ধি ও সামাজিক আচারঃ- বম সমাজভূক্ত কোন পরিবারে সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার ৭দিন পর ধাত্রীসহ উপস্থিত মহিলাদেরকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো হয়। নবজাতক শিশুর নামকরণ হয় পারিবারিক আনুষ্ঠানিকতায়। পরে গীর্জা বা চার্চে গিয়ে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়ে থাকে।

বিবাহ রীতিঃ- পাত্রী নির্বাচনকে বম ভাষায় ‘হেলহ’ বলা হয়’ প্রথমে পাত্র তার বন্ধুদের সহায়তায় পাত্রীর বাড়িতে গিয়ে পাত্রীর সাথে পরিচয় হয় এবং পাত্রী পছন্দ হলেই পরবর্তীতে পাত্র নিজেই মেয়ের কাছে গিয়ে প্রেম নিবেদন করে। নিয়ম অনুয়ায়ী ‘পালাই’ (ঘটক) দ্বারায় পর পর তিনবার প্রস্তাব দেবার পর সমমতি পাওয়া গেলে পাত্র-পাত্রী বৈবাহিক জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাপ - আলোচনা করে বিষয়টি অভিভাবকদের অবহিত করে। এরপর ‘রেল নো’ ও ‘রেল পা’ পরিচয়ের দু’জন ‘পালাই’ ঘটক বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে কনেপক্ষের বাড়িতে যায়। কনেপক্ষের চূড়ান্ত সমমতি পাওয়া পর কনের বাড়িতে ‘রেলপালাই’ (একের অধিক ঘটক) এর ‘রেল আন’ (ঘটক খাওয়ানো) ও ‘মান’ (পণ)সহ বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এরপর উভয়পক্ষের মৌখিক সমমতিতে বাগদান সম্পন্ন হয়। বাগদান সম্পাদনের সময় পাংহয় গোত্রে পাত্র হলে ১টি বল্লম ও ১টি মুরগী এবং সোনহ্লা গোত্রের হলে (পূর্বের রূপার ৩ টাকা) বর্তমানের নগদ ৩০ টাকা ও ১টি মুরগী বরপক্ষ থেকে কনের বাবাকে দিতে হয়। তবে পালিয়ে বিয়ে করলে পাত্রকে কনের বাবাকে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা জরিমানা হিসেবে দিতে হবে। টাকা দেয়ার পর একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করে কনের আত্মীয়স্বজনদের ডেকে এনে উক্ত টাকা থেকে মামা, মা-বাবা, পিসী, ভাই ও মামাতো ভাইদের মাঝে প্রথানূযায়ী ভাগ করে দেয়া হয়ে থাকে।

সামাজিক ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানঃ- সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়মে আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে কনে নিয়ে বরের বাড়িতে পৌছানোর পর বন্দুকের গুলি ছুঁড়ে পাড়া-প্রতিবেশীকে নববধূর আগমন বার্তা জানানো হয়। এ সময় গ্রামের লোকজন নববধূকে নিয়ে আনন্দের মাধ্যমে নব বধূকে বরণ করে নেয়।

সৎকার রীতিঃ- বম সমাজভূক্ত যে কোন পরিবারের কারো মৃত্যু হলে পাড়া বা গ্রামের সকল লোকজন শোক প্রকাশের জন্য সমবেত হয়। মৃতদেহকে ঘরে মেঝেতে রাখা হয়। মৃতের আত্মীয়স্বজন আসার পর সৎকার আয়োজন করেন। যতদিন পর্যন্ত মৃতের সৎকার না হয়, তার পরিবারে ততদিন পর্যন্ত দিনরাত ধর্মীয় গান ও সাংসারিক কাজ-কর্ম বন্ধ থাকে। বম সমাজে মাটি খুড়েঁ কবর দেয়ার প্রচলন রয়েছে।

ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক প্রথাঃ- বম নৃ-গোষ্ঠী আদিকালে জড়োপাসক ছিল। জোড়পাসক বমরা সৃষ্টিকর্তাকে বলে ‘পাথিয়ান’ ‘খোজিং’ বমদের প্রধান দেবতা। আদিকালে বমদের মধ্যে পশুবলির প্রচলন ছিল। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর পর মানুষের আত্মা বড় একটি পাহাড়ে চলে যায়। জীবিত অবস্থায় যে ব্যক্তি পূণ্য কাজ করে মৃত্যুর পর সে ব্যক্তি নতুন দেহ নিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে। দেবতার খোজিংর অনুগ্রহে। বম নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে জড়োপাসক ভূত-প্রেত, ঝাঁড়-ফুঁক, তন্ত্র-মন্ত্র, ওঝা-বৈদ্য, জ্যোতিষ বিদ্যার প্রতি বিশ্বাস ছিল।

বম নৃ-জনগোষ্ঠির আদি সংস্কৃতিঃ- বম আদিবাসীদের মধ্যে বড় কোন সামাজিক উৎসব নেই। বম আদিবাসীরা কুমথার চিবাই উৎসব পালন করে থাকে। কুমথার চিবাই এর অর্থ হল ‘নবান্ন‘ উৎসব। তবে আদি সংস্কৃতি রয়েছে। এগুলো হল বাঁশ নৃত্য, লাইফা নৃত্য ও সিং নৃত্য তাদের মাতৃভাষায় রচিত বিভিন্ন গান। আদিকালে তারা প্রকৃতি পূজা করত। বর্তমানে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছে।

কুমথার চিবাই উৎসবঃ- নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে কুমথার চিবাই উৎসব জন্য সামাজিক ব্যাপক অনুষ্ঠানমারার আয়োজন করা হয়। বম সম্প্রদায় নতুন বছরকে জাক-জমকের সাথে উদযাপন করে থাকে। এ সময় বম অধ্যুষিত পাড়াগুলোতে চলছে নানা আয়োজন। ঘরে ঘরে চলছে উৎসবের আমেজ। বম আদিবাসীরা ইংরেজী বছরের প্রথম দিন আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন করে থাকে। বম ভাষায় নতুনকে বলা হয় ‘কুম’, বছরকে ‘থার’ এবং শুভেচ্ছাকে ‘চিবাই’ অর্থাৎ নতুন বছরের শুভেচ্ছাকে তারা ‘কমু থার চিবাই’ বলে থাকে। নতুন বছরের প্রথম দিন তাই বম আদিবাসী পাড়া গুলোতে চলে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পিকনিকসহ নানা আয়োজন। বিশেষ করে বম তরুণ-তরুণীরা দল বেঁধে নানা আয়োজনে মেতে উঠে। পাড়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে চলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা। গীর্জা গুলোতে চলে প্রার্থনা ও ভোজের আয়োজন। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সকলে প্রার্থনাস্থলে সমবেত হয় এবং পুরাতন বছরের ভুল শুধরে নতুন বছরের মঙ্গল কামনা করা হয় প্রভুর কাছে। এই প্রার্থনার পাশাপাশি চলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরনের। এসব উৎসবে অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন যোগ দেয়।

© ২০১৫ বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ (বিএইচডিসি)